উখিয়া নিউজ ডটকম
প্রকাশিত: ০২/০২/২০২৬ ১১:৪৩ এএম

​২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সময়। একটি বৈষম্যহীন এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণেরা রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষাকে একটি স্থায়ী আইনি রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ারই মূল ভিত্তি হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’।এটি ২০২৫ সালের ১নং আদেশ। এই আদেশের লক্ষ্য কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের মূল কাঠামো বা সংবিধানে এমন সংস্কার আনা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিবাদী শাসনের জন্ম না হয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর গণভোট এই নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
​এই আদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর ওপর সাধারণ মানুষের মতামত নিতেই আয়োজন করা হচ্ছে গণভোট। যদি এই গণভোটে জনগণের ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়, তবেই জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের আইনি পথ উন্মুক্ত হবে। এটি নিশ্চিত করে যে, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের ইচ্ছায় নয়, বরং দেশের কোটি কোটি নাগরিকের প্রত্যক্ষ রায়ে নির্ধারিত হবে। সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক যে জনগণ, এই গণভোটের মাধ্যমেই তার প্রতিফলন ঘটবে।
​গণভোটে ইতিবাচক রায় আসার পর শুরু হবে সংবিধান সংস্কারের মূল কাজ। আদেশে বলা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের নিয়েই একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হবে। এটি একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সংস্কারের মূল দায়িত্ব পালন করবেন। মজার বিষয় হলো, নির্বাচিত সদস্যরা তাঁদের নিজ নিজ সংসদীয় আসনের জন্য শপথ নেওয়ার পাশাপাশি একই দিনে এই সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে সংসদীয় কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিষদ প্রথম অধিবেশনের দিন থেকে মাত্র ১৮০ কার্যদিবস বা প্রায় নয় পঞ্জিকা মাসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করার একটি কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যাতে সংস্কার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই দীর্ঘায়িত না হয়।
​পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে পরিষদের একজন সভাপ্রধান ও একজন উপ-সভাপ্রধান নির্বাচিত করা হবে। সভাপ্রধান নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পরিষদের বয়োজ্যেষ্ঠ একজন সদস্য পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সম্মতিক্রমে বৈঠকে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ত্রিশ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ন্যায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে।
​পরিষদের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নিয়ম রাখা হয়েছে। সংস্কারের যেকোনো প্রস্তাব পাস করতে হলে পরিষদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতি বাধ্যতামূলক। এটি নিশ্চিত করে যে, সংবিধানের প্রতিটি পরিবর্তন যেন জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়। কোনো বিষয়ে ভোট সমান হয়ে গেলে সভাপ্রধান তাঁর নির্ণায়ক ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। পরিষদের সভা পরিচালনার জন্য অন্তত ৬০ জন সদস্যের উপস্থিতি বা কোরামের বিধান রাখা হয়েছে, যা আলোচনার গুরুত্বকে ত্বরান্বিত করবে।

​এই সনদের অন্যতম যুগান্তকারী প্রস্তাব হলো বাংলাদেশে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ প্রবর্তন করা। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে কেবল একটি কক্ষ বা হাউস থাকলেও, নতুন প্রস্তাবে ১০০ সদস্যের একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এর মেয়াদ হবে শপথ গ্রহণের দিন থেকে নিম্নকক্ষের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত।
​আসুন একটি উদাহরণ দেখি:
মনে করুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হলো ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে; জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকা হবে একই বছরের ১২ মার্চের মধ্যে। ১২ মার্চের পরে সংবিধান সংস্কারের জন্য সংস্কার পরিষদ পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবস সময় পাবেন—অর্থাৎ প্রায় নয় পঞ্জিকা মাস সময় পাবেন।সংবিধান সংস্কার কার্য সম্পন্ন হবার পরবর্তী ত্রিশ কার্যদিবস বা প্রায় দেড় মাসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
উপরিউক্ত হিসাব অনুযায়ী উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে সর্বসাকুল্যে চার বছর।
​এই উচ্চকক্ষটি গঠিত হবে ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ বা পিআর পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, জাতীয় নির্বাচনে দলগুলো মোট যত শতাংশ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তারা উচ্চকক্ষের আসন লাভ করবে। এই ব্যবস্থার ফলে ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ভবিষ্যতে সংবিধানের কোনো সংশোধনী আনতে হলে এই উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সম্মতি লাগবে, যা একক দলীয় আধিপত্য ঠেকানোর শক্তিশালী দেয়াল হিসেবে কাজ করবে।
​সংবিধান সংস্কারের পর যে পরিবর্তনগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা সম্ভব, সরকার তা দ্রুত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেবে। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে এই সংস্কার সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে বলে আশা করা যায়। ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ এবং ন্যায়নিষ্ঠ আগামীর পথে বাংলাদেশের সম্মিলিত পদযাত্রা।

লেখক:
জিয়াউর রহমান মুকুল,
মানবাধিকার ও উন্নয়ন কর্মী।
১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

পাঠকের মতামত

 

“বিগত প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, বাস্তবায়নই হোক উখিয়া-টেকনাফের আগামী”

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত  উপজেলা—উখিয়া ও টেকনাফ। এই জনপদ আজ মাদক, ...

ভুল হোক ফুল

আমাদের এই ছোট্ট জীবনটার পুরোটাই হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্র।যত সময় যাচ্ছে, ততই যেন আমরা নতুন বিষয় ...